পাখির চোখে দেখা
শীতের সময় এখানের রূপ দেখেছিলাম সরল, পাতা ঝরা, আর বর্ষায় এর বিপরীত। দুর্গম পথে বড় বড় ডালপালা রাস্তার উপরে আছড়ে পড়েছে। ঘন জঙ্গল, রাস্তা প্রায় দেখাই যায় না। মনে হচ্ছে এখনই ভয়ঙ্কর কোনো প্রাণী এসে গাড়ির সামনে দাঁড়াবে।
Blog
শীতের সময় এখানের রূপ দেখেছিলাম সরল, পাতা ঝরা, আর বর্ষায় এর বিপরীত। দুর্গম পথে বড় বড় ডালপালা রাস্তার উপরে আছড়ে পড়েছে। ঘন জঙ্গল, রাস্তা প্রায় দেখাই যায় না। মনে হচ্ছে এখনই ভয়ঙ্কর কোনো প্রাণী এসে গাড়ির সামনে দাঁড়াবে।
Date
travel
এবারের প্রস্তুতি আর পরিকল্পনাটা ছিল একটু অন্যরকম। ঈদে বান্দারবান যাওয়া হবে। অনেক গহিনে, অনেক ভেতরে, দুচোখ যেখানে জুড়িয়ে যাবে। মন শীতল হবে ঝরনার ধারা দেখে, উড়ন্ত প্রজাপতি দেখে, বিচিত্র সব গাছ-গাছালি দেখে। সবুজ অরণ্য আর পাহাড় পর্বত দেখে। সাত দিনের এক লম্বা সফর ছিলো এবার, কত স্মৃতি যে এখন চোখের সামনে ভেসে উঠছে, সব কথা কি করে বলে বোঝাই। কতো বিচিত্র এ দুনিয়া, তার মানুষ, প্রকৃতি! পাহাড়ি মানুষের সে সরলতা, মিষ্টি হাসি, মানুষকে কাছে টানার যে আন্তরিকতা। পাহাড়ে যারা যায়, বারবারই যেতে ইচ্ছে করে। পাহাড়ের পর পাহাড়, মেঘের পর মেঘ ছুঁতে চায় মন। এই মন যেন উড়ন্ত এক পাখি, ডানা মেলে শুধু উড়ে চলে যেতে চায় এ পাহাড় থেকে ও পাহাড়ে। বান্দরবানের এ পাহাড়গুলো বৈচিত্রে ভরা। সবুজ অরণ্য যেন নীল আকাশের সাথে মিতালী করে চলেছে। আমরাও তাদের বন্ধু হতে চাই। বারবার যেতে চাই এমন অনিন্দ্য সুন্দর ঠিকানায়।
প্ল্যান মাফিক শুরুটা করতে চেয়েছিলাম এভাবে- প্রথমে যাবো বান্দরবান শহর থেকে থানচি হয়ে, তিন্দু পর্যন্ত, তারপর বড় পাথারিয়া হয়ে, রেমাক্রি বাজার, রেমাক্রি ফলস্রে উপর দিয়ে জিন্না পাড়া- সোলাকিয়া পাড়া-ডোলারাং পাড়া-ডুলাচাং পাড়া-শিয়ালোপি পাড়া-থিন ডালতে পাড়া-ক্রিসবা পাড়া- আরিফ পাড়া, আরো বহু বিচিত্র জায়গা পেরিয়ে তিন মুখ হয়ে রাইখিয়াং পাড়া দিয়ে রুমা বাজারে নামবো। সময় থাকবে হাতে সাতদিন, এর মধ্যে সব জায়গা ঘুরে ঘরে দেখা।
অনেক জল্পনা কল্পনার পর, বান্দরবান শহরে নেমেই সব ভেস্তে গেলো। আর্মি আমাদের থানচি দিয়ে প্রবেশের অনুমতি দিচ্ছে না, যদিও প্রথমে তারা রাজি হয়েছিলো আমাদের যাওয়ার ব্যাপারে। অনেক অনুরোধ, তদবির চললো, কোনকিছুতেই কাজ হচ্ছে না। আমাদের কোন ভাবেই যেতে দেবে না। আমরাও পণ করলাম এ পথে না হোক অন্য পথ দিয়ে হলেও যাবো। জিপের উপর বসে আমাদের দলনেতা গনিভাইয়ের আদেশের আপেক্ষায় রইলাম। সবার মনটাই কেমন ভারি হয়ে আসছিলো। ভাবছিলাম আশা না গুড়ে বালি হয়ে যায়। আর্মি ক্যাম্প থেকে শাহীন ভাই আর গনি ভাইরা ফিরে আসলে আমাদের মনে একটু আশা জাগলো। এবার যদি কোন ভাল খবর থাকে।
আমাদের সব ধরণের প্রস্তুতিই ছিলো যাবার ব্যাপারে। সব রুটের ম্যাপও তৈরি করে ফেলেছিলাম। কিন্তু শাহীন ভাইয়ের চেহারা দেখে তেমন কিছু আঁচ করা গেলো না। সবার মন খারাপ, চাঁন্দের গাড়িতে তখনও আমরা বসে আছি থানচি যাবো বলে। গনিভাই যদি শেষ ভরসায় কিছু একটা বলে। বললো,“কিরে তোরা এমন করছিস কেনো? এ্যডভেঞ্চার করতে বেরিয়েছি, না করেতো আর বাড়ি ফিরছি না।”\
কত ত্যাগ স্বীকার করে একেকজন ঈদের রাতে পরিবার ফেলে চলে এসেছে, পাহাড়ের টানে, এ্যডভেঞ্চারের নেশায়। শাহীন ভাইয়ের আম্মা কেঁদেই ফেলেছেন। তারপরও ছেলেকে আটকে রাখতে পারেনি। ঘুরে বেড়ানোর নেশা তাকে এ পর্যন্ত টেনে এনেছে।
বান্দরবানের যে রুটেই যাই না কেনো আমাদের পূর্বপ্রস্তুতি থাকে। তবে এবার যাবার আগে দল বাছাইয়ের একটি কঠিন কাজ করে ফেলেছে আমাদের দলনেতা। একে অবশ্য বাছাই না বলে ছাটাই বলা চলে। কাকে রেখে কাকে দলে ভেড়াবে তা ছিলো সত্যিই কঠিন কাজ। নোমানি ভাই আর জিলানী ভাইয়ের মুখ কালো হলো আর ফায়হাম হালই ছেড়ে দিলো। এতকিছুর পরও দলে ভিড়ে গেলাম আমরা ১৪জন।
এ ধরণের দুর্গম পথে সবসময় কমসংখ্যক বা ছোট টিম বানানো উচিত। এতে করে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বল্প সময়ে স্বিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়। একে অন্যের মধ্যে সমযোতা আর সংযোগ বৃদ্ধি পায়। যাওয়ার আগে প্রতিজনের জন্য প্রয়োজনীয় কিছু জিনিসের প্যাকেট বানালাম। এর মধ্যে ছিল মিষ্টি জাতীয় আইটেম,ওরাল স্যালাইন, প্রয়োজনীয় ঔষুধপত্র, খেজুর, বাদাম আরো অন্যান্য জিনিসপত্র। বুট-জুতা-স্যান্ডেল যে যার সুবিধামতো আগেভাগেই জোগাড় করে ফেললো । সবাইকে অন্তত এক বোতল করে পানি নেয়ার জন্য জানানো হয়েছিল, যারা পানি নেয়নি, তারা পাহাড়ে ওঠার পরই হাড়ে হাড়ে তা টের পেয়েছে। হাঁটতে হাঁটতে যখন গলা শুকিয়ে কাঠ তখন অপেক্ষায় থাকতে হবে কখন ঝরনার পানি সামনে আসবে। দূর্গম এসব রাস্তায় ঝিরি বা ঝর্ণার পানিই পাহাড়ীদের একমাত্র ভরসা। আমাদেরও সৌভাগ্য হয়েছিল সেসব ঝর্ণা ধারার পানি পান করার। বৃষ্টির পানির সাথে এসব ঝর্ণা ও ঝিরির পানি গিয়ে মিশে সাগরে। ঝিরির পানি পরিষ্কার ও স্বচ্ছ। আমরা সে পানি অনায়াসে খেয়েছি, সময়ে আবার হ্যালোটেব মিশিয়ে নিয়েছি। চলতে চলতে যখন ক্লান্ত-শ্রান্ত তখন চকলেট, খেজুর, সেলাইন পানি খেয়েছি। পানি শেষ হয়ে এলে আবার বোতলে ঝিরির পানি ভরে নিতাম। পুরো পথ ছিলো বেশ কষ্টসাদ্ধ।
ঢাকা থেকে এস.আলম বাসে বান্দরবান শহরে পৌঁছে গিয়েছিলাম খুব ভোরে ভোরেই। সেই পূর্বচেনা প্রাণের শহর, পাহাড়ের কোল ঘেঁষে উঁচু নিচু রাস্তা। শহর থেকে থানচি বা কইখক্ষঝিরি যেতে চাঁদের গাড়িগুলো ছেড়ে যায় একে একে। পাহাড়ি পথে চাঁদের গাড়িই ভরসা। এছাড়াও ফোর হুইলার জিপ রিজার্ভ করে যাওয়া যায় আশে পাশে।
আমরা তখনো চাঁদের গাড়ীতে বসে গনিভাইয়ের চেহারার দিকে তাকিয়ে আছি, যদি আমাদের প্ল্যানমতো কাজ হয়। অবশেষে ঠিক হলো বগালেক দিয়ে রাইখিয়াং যাবো। প্রথমে বান্দরবান শহর থেকে কইখক্ষঝিরি হয়ে রুমা বাজার। শহর থেকে এ রাস্তাটি বেশ পাকাপোক্ত, তারপরও প্রতি বর্ষায় রাস্তার অবস্থা বেশ খারাপ হয়ে যায়। বেশ কয়েকবছর আগে আমরা কয়েকজন সাইকেল নিয়ে কেওক্রাডংয়ের চূড়ায় অভিযান করেছিলাম। মনের দৃশ্যপটে আবার সেই স্মৃতিগুলো ভেসে উঠলো। এসব রাস্তায় চাঁদের গাড়িতে ঘুরতে এক অন্যরকম রোমাঞ্চকর অনুভূতি। কখনো মেঘের কোলে হীমশীতল পরশ আবার একটু পরেই মেঘ রোদ্দুরের খেলা। সেই খেলা বার বার দেখতে ইচ্ছে করে, রংধনু, পাখির মত ডানা ঝাপটিয়ে এ পাহাড় থেকে ও পাহাড়ে উড়তে ইচ্ছে করে। ডানা মেলে না পারলেও আমরা দুপায়েই পৌঁছেছিলাম প্রকৃতির এ মিত্রদের কাছে।
জিপ দ্রুত পৌঁছে গেলো কইখক্ষঝিরিতে। রুমা বাজারের জন্য নৌকা ঠিক করতে চলে গেলো আমাদের শাহীন ভাই। বরাবরের মত তার কাঁধেই এ দায়িত্ত । আর্মি ক্যাম্প সামলানো, যানবাহনের তদারকি, তিনি সব কিছু ম্যানেজ করে ফেলেন! আমরা থ’বনে যাই। কিস্তু থানচি দিয়ে যাওয়ার ব্যপারটা বেচারা আর ছুটাতে পারলো না।
নৌকা ঠিক করা হয়ে গেছে, আধাঘন্টার পথ রুমা বাজার। পথে একটা আর্মি ক্যাম্প পড়ে, সেখানে নাম লিখাতে হয় আগতদের। শাহীন ভাইয়ের ডাক পড়ে। ঢাকা থকে এবার আমাদের নাম ঠিকানাসহ সব কিছু প্রিন্ট করে নিয়ে এসেছি, তাতে করে সময়টা বাঁচানো গেছে। আমরা সাঙ্গু নদী ধরে রুমা বাজারের দিকে যাচ্ছি। এ নদীর প্রবাহ বেশ দীর্ঘ এবং বর্ষায় এর রূপও ভিন্ন সঙ্গে অনেক স্রোত।
তবে শীতে গেলে দেখবেন কত শান্ত আর নীটল পানির ¯্রােত, তলদেশ একেবারে স্বচ্ছ। রুমা বাজারে গিয়ে আমরা আরেকবার প্ল্যান প্রোগ্রামটা ঝালাই করে নিলাম। আমাদের সময় বাঁচাতে হবে এবং গন্তব্যে পৌঁছাতে হবে। রুমা বাজার থেকে নতুন একজন গাইড নেওয়া হলো, নাম বাঁশি মং। সজারুর মতো খাড়া চুল, হাত দিলে কাটা লাগার মত। জাতে বম, হালকা গড়ন, পান চাবায় আর একটু বেশি কথা বলে। ধীরে ধীরে সে আমাদের ভাল বন্ধু হয়। বান্দরবানে ট্রেকিং এর জন্য গাইডের প্রয়োজন পড়ে, কারন স্থানীয় এ গাইডরা পথঘাট বেশ ভাল চেনে। কোন রাস্তা দিয়ে গেলে আমাদের জন্য বেশি সুবিধা হবে, ঝিরি পাওয়া যাবে তা তারা বলে দিতে পারে অনায়াসে।
রুমা বাজারে দুপুরের খাবার খেয়ে জিপে চড়ে বসলাম, বগালেক গন্তব্য। শীতের সময় এখানের রূপ দেখেছিলাম সরল, পাতা ঝরা, আর বর্ষায় এর বিপরীত। দুর্গম পথে বড় বড় ডালপালা রাস্তার উপরে আছড়ে পড়েছে। ঘন জঙ্গল, রাস্তা প্রায় দেখাই যায় না। মনে হচ্ছে এখনই ভয়ঙ্কর কোনো প্রাণী এসে গাড়ির সামনে দাঁড়াবে। জিপটা ছিলো খোলা, তাই রাস্তা দিয়ে তাকালেই মনে হচ্ছিলো এই বুঝি গাড়িটা আমাদের নিয়ে নিচে পড়ে যাবে। রাস্তা এবড়ো-থেবড়ো, আর ভাঙ্গাচোড়া। গাড়ি বেশ ধীরগতিতে চলছে, এদিকে গোধুলী লগ্নের সময় হয়ে এসেছে। হঠাৎই গাড়ি থেমে গেলো, আর যেতে পারবে না, রাস্তা এখানেই শেষ। এখন আমাদের শুধু দু’পায়ে ভরসা। ঘন ঝোপঝাড় আর জঙ্গলের মাঝখান দিয়ে চলতে শুরু করলাম, সঙ্গে ব্যাগব্যাগেজও চড়লো। হাঁটার কষ্ট মূলত এখান থেকেই শুরু হবে। হাঁটতেই থাকলাম, সন্ধ্যার আকাশে তারারা উঁকি দিলো। পরিষ্কার আকাশ ছিলো সেদিন, পাখিডাকা সন্ধ্যা, চারপাশে নির্জনতা, ঝিঁঝিঁ পোকারা ডাকছে। মাঝে মাঝে নাম না জানা কত প্রাণীর কলরব। আমরা হাঁটছি তো হাঁটছি, এবং ভারি নিঃশ্বাস ফেলছি। অন্ধকারের আবেশে আমরা ঢাকা পড়লাম। সঙ্গে থাকা ক্ষীণ আলো আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে গেল বগা লেক পর্যন্ত। মনে পড়ছে এমন কোনো এক রাতে আমরা সাইকেল ঠেলে বগা লেকে পৌঁছেছিলাম।
লেকের দিকে তাকিয়ে থাকলে সব কষ্ট দূর হয়ে যাবে। বেশ স্বচ্ছ এই লেকের পানি। সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে এর উচ্চতা ৪৫৭ মিটারেরও বেশি আর এর গভীরতা ৩৮মিটার।
আমাদের দল বগা লেকে পৌঁছতে রাত ৮টা বেজে গেলো। আমরা লারামের বাড়িতে উঠলাম। যারা এ পথে ট্রেকিং করে তারা লারামকে মোটামুটি চেনে, সে গাইডের কাজ করে। আমাদের জন্য রান্নার ব্যবস্থা হলো, তারপর খেয়েদেয়ে ঘুম। পরদিন ভোরে আবার হাঁটতে হবে অনেক পথ।
সকালে সবাই নাস্তা করে রওনা দিলাম সাইকত পাড়ার দিকে। সাইকত পাড়াকে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পাড়া বলে। এখানে বমদের বসবাস, তারা মূলত মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠীর। ঘরবাড়িও বেশ পরিষ্কার ও পরিপাটি। দূর্গম জায়গায় এলে আমরা তাদের ঘরবাড়িতেই রাত্রিযাপন করি। পরদিন বগালেক থেকে লারামের চাচা লালজিক ও ডক্টর মনিরুল এইচ খাঁন মৃদুল ভাইয়ের ব্যাগ নিতে মংখিয়াকে সঙ্গে নিলাম। লালজিক বেশ শক্ত সমর্থ মানুষ, পথঘাটও ভাল চেনে। এই ট্রিপে আমাদের বেশ সাহায্য করেছিল গাইডরা।
পাহাড় বেয়ে শুধু উঠছি তো উঠছি। কখনো খাড়া উঠে যাওয়া আবার কখনো ছুটে চলা ঝিরির পানির স্রোতের মধ্যে দিয়ে হাঁটা। একবার পানিতে তো আরেকবার মাটিতে, পিচ্ছিল পাথর, ভেঙ্গে পড়া গাছের গুড়ি, ডালপালা সব মাড়িয়ে আমরা শুধু হেঁটেই চলেছি। সবুজ আর সবুজ চারদিকে, পাখির কলোরব আর পানির শব্দ যেনো বার বার আমাদের মোহিত করে। হঠাৎ ওয়াকিল ভাই বলে উঠলো, “আহা! আমাদের নিত্যদিনের চলার পথ যদি এমন হতো।” সত্যিই বেশ রোমাঞ্চকর!
হাঁটতে হাঁটতে পানির তেষ্টায় কাতর হই আর একটু জিরিয়ে নেই। রবিন ভাই সবার আগে সমর্পন করলো, তার ভারী ব্যাগ আর কাঁধে রাখতে পারছে না। ট্রেকিং এ যেতে ব্যাগ গোছানোর ব্যাপারে সবসময় সচেতন থাকতে হয়, কোন জিনিসটি আমার জন্য বেশি প্রয়োজনীয় আর কোনটি তুলনামূলক কম প্রয়োজনীয়, সেভাবেই ব্যাগ গোছানো উচিত।
লেকের দিকে তাকিয়ে থাকলে সব কষ্ট দূর হয়ে যাবে। বেশ স্বচ্ছ এই লেকের পানি। সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে এর উচ্চতা ৪৫৭ মিটারেরও বেশি আর এর গভীরতা ৩৮মিটার।
আমাদের দল বগা লেকে পৌঁছতে রাত ৮টা বেজে গেলো। আমরা লারামের বাড়িতে উঠলাম। যারা এ পথে ট্রেকিং করে তারা লারামকে মোটামুটি চেনে, সে গাইডের কাজ করে। আমাদের জন্য রান্নার ব্যবস্থা হলো, তারপর খেয়েদেয়ে ঘুম। পরদিন ভোরে আবার হাঁটতে হবে অনেক পথ।
সকালে সবাই নাস্তা করে রওনা দিলাম সাইকত পাড়ার দিকে। সাইকত পাড়াকে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পাড়া বলে। এখানে বমদের বসবাস, তারা মূলত মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠীর। ঘরবাড়িও বেশ পরিষ্কার ও পরিপাটি। দূর্গম জায়গায় এলে আমরা তাদের ঘরবাড়িতেই রাত্রিযাপন করি। পরদিন বগালেক থেকে লারামের চাচা লালজিক ও ডক্টর মনিরুল এইচ খাঁন মৃদুল ভাইয়ের ব্যাগ নিতে মংখিয়াকে সঙ্গে নিলাম। লালজিক বেশ শক্ত সমর্থ মানুষ, পথঘাটও ভাল চেনে। এই ট্রিপে আমাদের বেশ সাহায্য করেছিল গাইডরা।
পাহাড় বেয়ে শুধু উঠছি তো উঠছি। কখনো খাড়া উঠে যাওয়া আবার কখনো ছুটে চলা ঝিরির পানির স্রোতের মধ্যে দিয়ে হাঁটা। একবার পানিতে তো আরেকবার মাটিতে, পিচ্ছিল পাথর, ভেঙ্গে পড়া গাছের গুড়ি, ডালপালা সব মাড়িয়ে আমরা শুধু হেঁটেই চলেছি। সবুজ আর সবুজ চারদিকে, পাখির কলোরব আর পানির শব্দ যেনো বার বার আমাদের মোহিত করে। হঠাৎ ওয়াকিল ভাই বলে উঠলো, “আহা! আমাদের নিত্যদিনের চলার পথ যদি এমন হতো।” সত্যিই বেশ রোমাঞ্চকর!
হাঁটতে হাঁটতে পানির তেষ্টায় কাতর হই আর একটু জিরিয়ে নেই। রবিন ভাই সবার আগে সমর্পন করলো, তার ভারী ব্যাগ আর কাঁধে রাখতে পারছে না। ট্রেকিং এ যেতে ব্যাগ গোছানোর ব্যাপারে সবসময় সচেতন থাকতে হয়, কোন জিনিসটি আমার জন্য বেশি প্রয়োজনীয় আর কোনটি তুলনামূলক কম প্রয়োজনীয়, সেভাবেই ব্যাগ গোছানো উচিত।
পরের গন্তব্য রাইখিয়াং, যার জন্য এতো প্রতিক্ষায় আছি। একে পুকুর পাড়াও বলা হয়। নতুনদিনের জন্য শক্তি সঞ্চয় হয়েছে রাতের ঘুম থেকে। রাইখিয়াং যাবার পথটুকু একটু বেশি উঠানামা করতে হলো তাই কষ্ট হয়েছে বেশ। তবে ঝিরি পেয়েছি আনেক সঙ্গে জোঁকতো ছিলই। গাইড বাশিমংয়ের জোঁকের ভয় নেই, দেখলাম একটা জোঁক ধরে তার গায়ের মধ্যে শলার কাঠি ঢুকিয়ে দিয়েছে। বাশিমংয়ের সাথে অনেক মজা করেছি। গনিভাই তার নাম দিল বনমালী। আমরাও বনমালী বলে ডাকা শুরু করলাম।
ঝিরি পথে বিশ্রাম নেওয়ার সময় আমদের সাথে দেখা হলো একদল পাহাড়ি ছেলে-মেয়ের। ওরা রুমা বাজার থেকে একদিনে রাইখিয়াং যাচ্ছে। আমরা শুনে থ’ বনে গেলাম। তারা সেখানে স্কুলে পড়ে। আমরা এই দলের এক ছাত্রীর সাথে গল্প করলাম। পরে অবশ্য পুকুর পাড়ায় তার আতœীয়ের ঘরেই আমরা রাতে ছিলাম।
আবার শুরু হলো হাঁটা। সামনের যে পাহাড়টা দেখা যাচ্ছে তারপরেই রাইখিয়াং লেক । এ কথা শুনে মনে আরো একটু জোর পেলাম। আমরা হাঁপিয়ে উঠি আর বনমালী আমাদের আশ্বাস দেয়, এইতো আর অল্প, এগিয়ে চলি। এমন করতে করতে চূড়ায় পৌঁছে রাইখিয়াং লেকের দেখা পেলাম। এতো সুন্দর কোনো জায়গাও হতে পারে পৃথিবীতে, তাও আমার দেশে কল্পনাও করতে পারিনি। সত্যিই অসাধারণ, বর্ণনা করার মতো ভাষা জানা নাই। জিপিএস জানান দিলো আমরা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৫৬০মিটার উপরে। এখান থেকে লেকটাকে ছোট্ট চৌবাচ্চার মতো দেখাচ্ছিলো। পানির উপরে বাঁশের ভেলাগুলো খেলনার মতো দেখালো। আর ঐপাড়ের ঘরগুলোকে মনে হলো একটি প্রাচীন জনাকীর্ণ জনপদ।
সামনের বিস্তীর্ণ সবুজের পরে ওই দূরে পাহাড়, যা বাংলাদেশ আর বার্মার সীমানা তৈরি করেছে; তা ছুঁয়েছে দিগন্ত। সব কিছু যেনো ছবির মতো সুন্দর। চূড়ার সেই একচিলতে জায়গায় বসে আমরা ঘোর লাগা চোখে তাকিয়ে ছিলাম যতদূর দেখা যায়। উপরে আকাশ-নীচে জল-সম্মুখে পাহাড়। হাওয়া বয়ে চলে গা ছুঁয়ে- আমরা বিস্মিত, পুলকিতো!
অনেকক্ষন বসে ছিলাম সেই সুন্দরের পানে চেয়ে। হঠাৎ করেই আকাশ অন্ধকারাছন্ন হয়ে এলো। আমারা ক্ষানিক সময় দূর পাহাড়ের বৃষ্টি পড়া দেখলাম। এ বৃষ্টি আমাদের দিকেই আসছে আশির্বাদ হয়ে। চিরদিন মনে থাকবে এমন বিভোর হয়ে থাকা সময়ের কথা। ক্যামেরায় স্মৃতিগুলো ধরে রাখলাম। চারপাশের অকৃত্রিম প্রকৃতি এর মাঝে উৎফুল্ল ক’জন মানুষ যারা এ সময়ে চিরসুখী, চিরযৌবনা। মানুষের আনন্দের সময়গুলোকে যদি ধরে রাখা যেতো। উঁচু জায়গাটায় দাঁড়িয়ে কল্পনা করছিলাম, যদি পাখি হতে পারতাম!
বৃষ্টি থামার পর নেমে এলাম পাহাড় থেকে। সেরাতে থাকলাম প্রয়ং পাড়াতে, রাইখিয়াং লেক থেকে একটু দূরে, ত্রিপুরা পাড়ায়। এখানে তেমন একটা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন না। রাতে একটা ছাগল জবাই হলো, আমরা পেট পুরে মজা করে খেলাম। প্রতিরাতেই আমাদের গানের আসর বসে। ওয়াকিল ভাইয়ের দরাজ গলা আমাদের সবসময়ই মাতিয়ে রেখেছে। তিনি গান লিখেন ও সূর করেন। শাহীনভাই গানের সাথে নৃত্য করেছে। রাত গভীর হলে, এক আকাশ তারা মাথায় নিয়ে ক্লান্ত দেহে স্লিপিং ব্যাগে ঢুকে পড়লাম।
পাহাড়ের সকালটা অনেক সুন্দর। নাস্তা করে সেখান থেকে বেড়িয়ে পড়লাম রাইখিয়াং লেক দেখতে। এর মধ্যে অঝোর ধারায় বৃষ্টি শুরু হলো। কেউ কেউ এগিয়ে গেল আমরা পেছনে থেমে গেলাম। বৃষ্টিতে রাস্তা এতো কাঁদা আর পিচ্ছিল হয়, ফলে যেকোন সময় দূর্ঘটনা ঘটতে পারে। বৃষ্টি থামলে রওনা হলাম। রাইখিয়াং লেকে যেতে রীতিমতো কঠিন অ্যাডভেঞ্চার করা লাগলো। তারপর যখন লেকের সামনে তখন সত্যিই অভিভূত। অসহ্য সুন্দর সেই লেক আর পানি। লেকের উপরেই আর্মি ক্যাম্প। মূলত লেকের দুই পাড়ে দুইটি পাড়া আছে। সবাই আফসোস করলাম এপাড়াতে থাকলে ভালো হতো। এখানকার স্থানীয়রা জানালো পুকুর পাড়ার ঝর্ণায় যাবার একটা পথ আছে তবে সেটা বেশ দূর্গম। অ্যাডভেঞ্চারের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে, সময় নষ্ট না করে সেই ঝরণা দেখতে রওনা হলাম।
এ পথ আরো রুক্ষ এবং কঠিন ঠেকলো। যাবার রাস্তাই আমরা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। গাইডরা গাছপালা কেটে কেটে আমাদের জন্য রাস্তা বানালো। এদিকে ক্ষুধা-তৃষ্ণায় সবাই কাতর। উপর থেকে একটা জুম ঘর দেখা যাচ্ছে। পাহাড়ে জুম চাষ করার সময় ঘর বানিয়ে তারা থাকে। এগিয়ে গেলে, একজনকে পাওয়া গেলো। পাহাড়ে মারফা বেশ জনপ্রিয়, যা একধরনের শশার মতো রসালো ফল। জুম ঘরে গিয়ে অনেক মারফা পেলাম, তা দিয়েই তৃষ্ণা মিটলো। জুম ঘরে থাকা লোকটি আমাদের পথ দেখাতে রাজি হলো।
বৃষ্টি থামার পর নেমে এলাম পাহাড় থেকে। সেরাতে থাকলাম প্রয়ং পাড়াতে, রাইখিয়াং লেক থেকে একটু দূরে, ত্রিপুরা পাড়ায়। এখানে তেমন একটা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন না। রাতে একটা ছাগল জবাই হলো, আমরা পেট পুরে মজা করে খেলাম। প্রতিরাতেই আমাদের গানের আসর বসে। ওয়াকিল ভাইয়ের দরাজ গলা আমাদের সবসময়ই মাতিয়ে রেখেছে। তিনি গান লিখেন ও সূর করেন। শাহীনভাই গানের সাথে নৃত্য করেছে। রাত গভীর হলে, এক আকাশ তারা মাথায় নিয়ে ক্লান্ত দেহে স্লিপিং ব্যাগে ঢুকে পড়লাম।
পাহাড়ের সকালটা অনেক সুন্দর। নাস্তা করে সেখান থেকে বেড়িয়ে পড়লাম রাইখিয়াং লেক দেখতে। এর মধ্যে অঝোর ধারায় বৃষ্টি শুরু হলো। কেউ কেউ এগিয়ে গেল আমরা পেছনে থেমে গেলাম। বৃষ্টিতে রাস্তা এতো কাঁদা আর পিচ্ছিল হয়, ফলে যেকোন সময় দূর্ঘটনা ঘটতে পারে। বৃষ্টি থামলে রওনা হলাম। রাইখিয়াং লেকে যেতে রীতিমতো কঠিন অ্যাডভেঞ্চার করা লাগলো। তারপর যখন লেকের সামনে তখন সত্যিই অভিভূত। অসহ্য সুন্দর সেই লেক আর পানি। লেকের উপরেই আর্মি ক্যাম্প। মূলত লেকের দুই পাড়ে দুইটি পাড়া আছে। সবাই আফসোস করলাম এপাড়াতে থাকলে ভালো হতো। এখানকার স্থানীয়রা জানালো পুকুর পাড়ার ঝর্ণায় যাবার একটা পথ আছে তবে সেটা বেশ দূর্গম। অ্যাডভেঞ্চারের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে, সময় নষ্ট না করে সেই ঝরণা দেখতে রওনা হলাম।
এ পথ আরো রুক্ষ এবং কঠিন ঠেকলো। যাবার রাস্তাই আমরা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। গাইডরা গাছপালা কেটে কেটে আমাদের জন্য রাস্তা বানালো। এদিকে ক্ষুধা-তৃষ্ণায় সবাই কাতর। উপর থেকে একটা জুম ঘর দেখা যাচ্ছে। পাহাড়ে জুম চাষ করার সময় ঘর বানিয়ে তারা থাকে। এগিয়ে গেলে, একজনকে পাওয়া গেলো। পাহাড়ে মারফা বেশ জনপ্রিয়, যা একধরনের শশার মতো রসালো ফল। জুম ঘরে গিয়ে অনেক মারফা পেলাম, তা দিয়েই তৃষ্ণা মিটলো। জুম ঘরে থাকা লোকটি আমাদের পথ দেখাতে রাজি হলো।
রাইখিয়াং ঝরনা দৈঘ্যে বেশ বড়। আমরা এর একটা অংশ মাত্র দেখতে পেরেছিলাম। হাঁটতে হাঁটতে এমন এক জায়গায় এলাম, খাড়া নামতে হবে। এই রাস্তা আগে কেউ ব্যাবহারও করেনি। তখনো মাথার উপর প্রখর রোদ কিন্তু যে জায়গায় নামতে যাচ্ছি সেখানে অন্ধকার। গাছগাছালি দিয়ে পুরো জায়গাটা ঢাকা পড়ে আছে। গা ছম-ছমে এবং স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ, পঁচে থাকা পাতার বাজে গন্ধ, ঝিঝি পোকার তীব্র আওয়াজ, আর কাদা। এর মধ্যে কি করে নামবো ভেবে পেলাম না। পেছন থেকে বারবার সামনে এগিয়ে যেতে বলছে, গাইডরাও ভেতরে এগিয়ে যাচ্ছে। ক্যামেরা সামলাবো নাকি, নিজেকে সামলাবো কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। উপরওয়ালার নাম নিয়ে নেমে পড়লাম পড়িমরি - এ্যাডভেঞ্চার বলে কথা! পা ফেলার পরে বুঝলাম এ কোথায় যাচ্ছি আমরা। এক পা ফেলি তো দ্বিতীয় পা ফেলার জায়গা খুঁজে পাই না। ভুল জায়গায় পা পড়লেই চলে যেতে হবে হাজার ফিট নিচে। পিচ্ছিল আর কাদামাখা-গাছের ঢাল ধরে ধরে এগোতে লাগলাম। পেছনে মুনির ভাই সাহস দিচ্ছে; সামনে রিপন, কিশোরভাইরা, সাবার পেছনে গনি ভাই। গাইড দন্তুদা সবসময় গনি ভাই’র সঙ্গে ছিল যেনো পড়ে না যায়। যতো নামছি ঝরনার শব্দ আরো প্রখর হতে থাকলো, মনে হলো এই বুঝি একটু নামলেই ঝর্ণার দেখা পাবো। নামছি তো নামছি, ঝর্ণার স্রোতের বিকট শব্দ আরো তীব্র হতে থাকলো। একসময় আমারা ভয়কে জয় করে পৌঁছে গেলাম সেই ঝর্ণার কাছে। আনন্দে জোরে একটা চিৎকার দিলাম। এত কষ্টের পর এত সুন্দর একটা ঝর্ণা দেখে সব ভুলে গেলাম।
একটা লম্বা ঢাল বেয়ে গড়িয়ে আসা পানি হচ্ছে এই ঝর্ণা। বর্ষা থাকায় বেশ স্রোতও ছিলো। বয়ে আসা পানি বিশাল বড় এক পাথরে ধাক্কা খেয়ে নিচে নেমে যাচ্ছে। আমরা পানি পেরিয়ে সেই পাথরের উপর চলে আসলাম। পিচ্ছিল ছিল জায়গাটা, কিন্তু তখনতো আর সেসব দিকে তাকাবার সময় নেই। আমরা সবাই আনন্দে আতœহারা, ছবি তোলায় ব্যাস্ত। পাড়া থেকে যে দাদা নিয়ে এলো, তাকে দেখলাম পাথর পার হয়ে ঝর্ণার ঢাল বেয়ে উপরে উঠে গেলো। মনে হলো সিনেমার কোনো শট দেখছি । উপর থেকে বসে স্রোতের পানির সাথে নিচে নেমে আসছে। আমরা সবাই ক্যামেরা তাক করলাম। সে এমনভাবে আরো দু‘একবার খেল দেখালো। বনমালীও তার দেখা খেল দেখাতে ঢাল বেয়ে উপরে চলে গেলো। আমারা আনেক্ষন আনন্দ-উল্লাস করলাম, ভিজলাম, ছবি তুললাম। এবার ফিরতে হবে, নাহলে সন্ধ্যার মধ্যে পাড়ায় পৌঁছাতে কষ্টকর হয়ে যাবে। উল্লাসের পর আবার সেই একই পথে উপরে উঠতে হলো বেশ কষ্ট করে। ফেরার পথে বিকেলটা ছিল বেশ মোহনীয়। দূর পাহাড়ে সবুজের রং কেমন হলদেটে ভাব ধারন করেছে। দিগন্ত রেখা পাহাড়ের গায়ে হেলে পড়েছে। পাখির চোখে দেখলে যেমন লাগে তেমন উপলব্দি করলাম। দেখলাম উঁচু এক গাছ পাহাড়ের মাথা ছাড়িয়ে উঠে পড়ে লেগেছে দিগন্ত ছোঁয়ার আশায়। সারাদিনের পর আমরাও মন দিলাম নিড়ে ফিরে যেতে। লেকের কাছে ফিরে দেখি, সময় বেশি নেই সন্ধ্যে হবার। লেকের পানিতে নামার ইচ্ছাটা অপূর্ণ রয়ে গেলো। আমাদের অগ্রগামী দল এসে লেকের পানিতে গোসল করেছে, মাছ ধরেছে। রাতটা বেশ আনন্দে কাটলো। পরদিন ফেরার পালা, রুমা বাজার যাবো বড়থলি হয়ে ভিন্ন রাস্তায়।
আজকের সকালের আবহাওয়া বেশ পরিষ্কার, মনে হচ্ছে আর বৃষ্টি-বাদল হবে না। ব্যাগ কাঁধে সবাই অনবরত হেঁটে চলেছি। বেলা বাড়তে লাগলো, সাথে তাপও। এখন নেমে যাচ্ছি, পাহাড়ে নামাটা একটু ঝামেলার। একবার পা ফসকে গেলেই হলো। কেউ কেউ এর মধ্যে আছাড় খেয়েছে, মশিউর ভাইয়ের অবস্থা শোচনীয়। সবার সঙ্গেই একটা করে লাঠি আছে।
বড়থলিতে আমরা পঞ্চম রাত কাটালাম। সেখাানেও একটা আর্মি ক্যাম্প আছে। বড়থলি থেকে চলে গেলাম পলিপ্রাংসা পাড়ায়। তার পরের রাত ছিলাম সানাক্র পাড়ায়। এ পাড়ায় পৌঁছাতে সবার অবস্থা খারাপ হয়ে গেলো। সেই সকাল বেলা রওনা হয়ে আমরা পৌঁছেছি অন্ধকার রাতে। অন্ধকারে উঁচু নিচু পাহাড়ী পথে হেঁটেছি অনেকখানি। সানাক্র পাড়ায় থাকার উদ্দেশ্য, সেখানে বড় একটা ঝর্ণা আছে। কারবারি বাচিংয়ের ঘরে সেরাতে থাকলাম। পরদিন সকালে রওনা হলাম সেই ঝর্ণা দেখতে। ঝর্ণার অনেকদূর পর্যন্ত পানির প্রবাহ দেখা যায়। উঁচু পাহাড়ের উপর থেকে পানির ঢল নেমে তা এঁকেবেঁকে চলে গেছে বহু নিচে। আমরা বড় ঝর্ণাটা পর্যন্ত যেতে পেরেছিলাম। এ ঝর্ণা প্রস্থে বড় এবং স্রোতও প্রচুর। ছবি তুলে ফিরে এলাম আবার পাড়াতে। সব গুছিয়ে রওনা হলাম রুমা বাজারের দিকে। সন্ধ্যার আগেই আমাদের রূমাবাজারে পৌঁছাতে হবে। সামনের পাহাড় দেখেতো মনে হচ্ছে না একে অতিক্রম করতে পারবো। খাড়া আর পাথুরে পাহাড়। গাইডরা বললো এ-পাহাড়টা পার হলেই সামনে সহজ পথ। কিন্তু টপকাতে টের পেলাম সবাই।
আমরা সময়মতই রুমা বাজারে পৌঁছাতে পেরেছি, এরপর জিপে করে বান্দরবান। সে-রাতে শহরের রিসংসং চাইনিজ রেস্টুরেন্টে খেয়েছি ভরপেট-কতদিনের অভুুক্ত। ফেরার সময় ফেলে এসেছিলাম পুরো পথের সঙ্গী লাঠিটাকে। সঙ্গে নিয়ে আসবো ভেবেছিলাম, হলো না। হয়তো বা আবার অ্যাডভেঞ্চারের নেশা চাপবে বলে।