মানুষ পৃথিবীর যেই প্রান্তে যাক তার পদচিহ্ন রেখে আসে। দেবতারাও এর ব্যতিক্রম নন। দেবতা শীব শঙ্করজী পার্বতী দেবীকে বিয়ে করার উদ্দেশে উত্তরাখÐের দিকে রওনা হয়েছেন। তার সঙ্গীরা বলে উঠলো, “ভোলে বাবা, আপনি শুভ কাজে রওনা হয়েছেন, নিজের সুরাতটা অন্তত ভালো করে দেখে পরিপাটি হয়ে গেলে ভালো হতো।” ভোলে বাবা
ভাবলেন, সত্যিই তো! শীব শঙ্করজী তার ত্রিশুল দিয়ে পাহাড়ের অনেক উঁচুতে একটা কুণ্ড তৈরি করলেন। তার স্বচ্ছ জলে নিজের রূপটা ভালো করে দেখে নিলেন। তারপর থেকে সেই কুÐের নাম হয়ে গেলো রূপের কুণ্ড বা রূপকুণ্ড! রূপকথা হোক আর সত্যি, দেবতাকে প্রণাম যে তিনি এমন এক রূপের কুÐ তৈরি করেছিলেন। তা না হলে কখনো এর সৌন্দর্য দেখার সুযোগ হতো না। অপরূপ সুন্দর এই কুণ্ড-এর অবস্থান ভারতের উত্তরাখর চামলি জেলায়। তবে এই কুণ্ডে পৌঁছোতে হলে বেশ কাঠখড় পুড়িয়ে যেতে হবে। এর জন্য দম লাগবে। কারণ এই কুÐের অবস্থান সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৬,৪৯৯ ফুট উপরে!
দু’মাস আগে কলকাতা থেকে টিকেট করেছিলাম দু’জনের জন্য। ট্রেক সঙ্গীর পরামর্শে নিজের মত একটা প্ল্যান দাঁড় করিয়েছিলাম। সেখানে দুটো অপশনের মধ্যে যে রাস্তায় কিলোমিটার বেশি হয় তাই বেছে নিলাম। রূপকুণ্ড ট্রেকের শুরুর পয়েন্ট হচ্ছে লোহাজং। তার ৮ কিলোমিটার আগে গোয়াল্ধাম। এই আট কিলোমিটার পথে ট্রেক করে লোহাজং পর্যন্ত যাওয়া যায়, সেই পথই ধরলাম।
সরকারি বাস কাউন্টারে গিয়ে খবর নিলাম গোয়ালধাম পর্যন্ত কোন বাস যায় না। ঋষিকেষ গিয়ে আবার বাস পাল্টাতে হবে। প্রাইভেট বাসের কাউন্টারে খোঁজ করতে বলল। সরকারি বাস ডিপো থেকে একটু সামনে এগিয়ে প্রাইভেট বাসের সন্ধান পেলাম। হরিদুয়ার থেকে গোয়ালধাম পর্যন্ত বাস যাবে। ভাড়া ৩৮০ রুপি। ছাড়বে রাত তিনটায়।
সবে সন্ধ্যা হয়েছে, সময় অনেক বাকি। অমিতদাকে ফোন দিলাম আশেপাশে দেখার মতো কিছু আছে কিনা জেনে নিতে। তিনি বললেন, হারকিপায়ুরি ঘাটে যেতে। গঙ্গার তীরে, যা হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের তীর্থস্থান। স্টেশন থেকে দু’কিলোমিটারের পথ। দেবতা শীবের পদচিহ্ন হিসেবে হারকিপায়ুরির ঘাটকে তারা মান্য করে। পায়ে হেঁটেই চলে গেলাম গঙ্গার তীরে। এক কোনে বসে ডায়েরি লিখতে শুরু করলাম আর ভুপেন হারাজিকার গানটা মাথায় এল, “বিস্তীর্ণ দুপাড়ে, অসংখ্য মানুষের হাহাকার শুনেও, নিঃশব্দে নিরবে ও গঙ্গা তুমি, গঙ্গা বইছো কেন!” গঙ্গার স্রোত এখানে তীব্র, কারণ পর্বতের গ্লেসিয়ার থেকে এর আগমন।
গঙ্গার দুইপাড়ে অসংখ্য মানুষ। বেশিরভাগ মানুষ এসেছে বিশ্বাস আর ভক্তি জানাতে এই গঙ্গার পাড়ে, পূজা আর গঙ্গাস্নান করছে। গঙ্গায় ¯্রােত এখানে অত্যাধিক। পাড়ের দুপাশে লোহার শেকল দিয়ে আঁটকে রাখা আছে। নারী পুরুষ তা ধরে এই ¯্রােতের মধ্যেই পূজা করে, পুণ্য স্নান করে। কেউবা ফুল দিয়ে মোড়ানো দ্বিয়া জ্বালিয়ে গঙ্গায় ভাসাচ্ছে। সারারাতই এখানে পূর্ণ্যার্থীরা থাকেন। এখানে মন্দিরটি ঘাটের এক পাশে। মন্দিরের একটা অংশ যেখানে খালি পায়ে প্রবেশ করতে হয় আর অন্য পাশে খোলা অংশ, সেখানে সবাই অনায়াসে যেতে পারে। সকলের বিশ্বাসকে শ্রদ্ধা করে সে অনুযায়ী মন্দিরে প্রবেশ করতে পারে সবাই।

অনেক রাত হয়েছে, এবার হাঁটতে হাঁটতে স্টেশনে ফিরে যাবো। স্টেশনে একটু গড়াগড়ি করে রাত দুইটার সময় বাসের কাছে গিয়ে দেখি সব সিট ভর্তি হয়ে গেছে। এমনকি আমারটাতেও কেউ বসে পড়েছে। কনট্রাকটারকে ডেকে এনে টিকিট দেখিয়ে তবে সিট পেলাম। বাস ঠিক রাত তিনটায় যাত্রা শুরু করলো। গোয়ালধাম এসে নামলাম দুপুরে। পথে
পড়লো রুদ্রপ্রয়াগ, কর্ণপ্রয়াগ যেখানে জিম করবেট এক সময় শিকারের জন্য বেরিয়েছিলেন। তার অমনিবাশ বইটা পড়ে বেশ রোমাঞ্চিত হয়েছিলাম। প্রায় ২০০ বছর আগে জিম করবেট এইসব অঞ্চলে নরখাদক চিতাদের শিকার করেছেন। তার বর্ণনায় আরো কত শিহরন জাগানো গল্প আছে জঙ্গলের। ‘রুদ্রপ্রয়াগের নরখাদক চিতা’ তার বইগুলোর মধ্যে অন্যতম।
রুদ্রপ্রয়াগ দিয়ে যাবার সময় মনে হলো আমার পাশেই বসে আছে বইয়ে পড়া সেই গ্রামের বাসিন্দাদের কোন বংশধর। যেখানে নরখাদক চিতারা মানুষদের হত্যা করতো। জিম করবেট সেই এলাকার মানুষদের রক্ষা করেছিলেন। তিনি যে শুধু শিকার করেছেন তা নয়, বন সংরক্ষনে তার অনেক ভ‚মিকা ছিল।
অমনিবাসের কথা ভাবতে ভাবতেই গোয়ালধাম পৌঁছে গেলাম। ভেজ থালি আর দুটো ডিমের অমলেট খেয়ে চাঙ্গা হলাম, এরপর হাঁটা ধরলাম ‘দেবালের’ পথে। আজকের রাতটা সেখানেই কাঁটাবো। ব্যাগে খাবার সহ অন্যান্য জিনিসে বেশ ভারী হয়েছে। বেলা তখন তিনটা বাজে। পায়ে হাঁটা পথে আট থেকে দশ কিলো মিটার পথ দেবাল। এই পথে সাধারণত স্থানীয়রা চলাফেরা করে। সাধারণ টুরিস্টরা গাড়িতে করে লোহাজং চলে যায়। দেবাল থামারও প্রয়োজন পড়ে না। পুরো ট্রেকিং পথটা বলতে গেলে একাই পাড়ি দিতে হলো। উঁচু নিচু পথ আর নিঃসঙ্গতা সমস্ত পথজুড়ে।
‘দেবাল’ পৌঁছুতে সন্ধ্যা হয়ে এলো। সঙ্গে যেহেতু ট্যান্ট ছিল, তাই কোনো গ্রাউন্ড খুঁজছিলাম। পথে একজন গল্প করছিলো আমার সাথে। তাকে জিজ্ঞেস করলাম স্কুলের মাঠ আছে কিনা? তিনি কাছেই একটা ফরেস্ট বাংলোর কথা বললেন। ফরেস্ট বাংলোর দিকে এগিয়ে গেলাম। বাজার এলাকা থেকে প্রায় এক বা দেড় কিলোমিটার দূরে হবে বাংলোটি। কাছাকাছি গিয়ে দেখলাম বাংলোটি পুরোপুরি ফাঁকা আর সুনসান। কোন দারোয়ান, চকিদারও নেই। গেটে বড় একটা তালা ঝোলানো। কিছুক্ষন জোর আওয়াজ করে ডাকলাম, কোথায়ও কেউ নেই। রাস্তায় দুজন লোক ছিলো, তাদের জিজ্ঞেস করলে বললো, এখানে কোনো দারোয়ান থাকে না। আমি ট্যান্ট পিচ করবো বলায় তারা বললো, নিশ্চিন্তে করুন। এখানে কেউ নেই। এখন জনমানবহীন এই বাংলোয় আমি একা একজন মানুষ। একটু ভ‚তুড়ে লাগছে, বেশ ছমছমে পরিবেশ। কিন্তু অপূর্ব, নিরিবিলি আর একা থাকার আনন্দ। অ্যাডভেঞ্চারে এমন একটু না হলে ঠিক জমে না। আলো নিভে যাবার আগেই বাংলোর বারান্দায় তাবু খাটিয়ে নিয়েছি। আর প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো বের করে হাতের কাছে রেখেছি। রাস্তা থেকে মূল বাংলোটা দেখা যায় না। গেট পার হয়ে প্রথমে দুটি ঘর, এরপরে সিঁড়ি বেয়ে একটু নিচের দিকে এই বাংলো। পাশেই নদী আর তীব্র ¯্রােতের শব্দ ভেসে আসছে। কেউ যেনো আমাকে নোটিস করতে না পারে তাই এদিক ওদিক না গিয়ে এখানেই বসে আছি। একটু অন্ধকার হলেই বাজারের দিকে যাবো। আগামীকাল লোহাজং এর গাড়ির খবরটা নিতে হবে। বাংলোর উঠানে দুটি ঘরের মধ্যে একটি গোসলখানা, তাতে ফ্রেস হয়ে নিলাম। গতকাল থেকে ভালো করে ঘুমাতে পারিনি। শরীর অনেক ক্লান্ত। একটা আরামের ঘুম দিতে পারবো, আশা করি যদি কোন ঝামেলা না হয়।

অন্ধকার হলে ‘দেবাল’ বাজারের দিকে গাড়ির খোঁজ নিতে গেলাম। এখান থেকে দুপুরের বাস যায় লোহাজং। সকালে সবাই যেতে চায় না। খোঁজ করতে করতে ইয়াশওয়ান নামে একজন ড্রাইভারকে পেলাম। সে পরদিন ভোর পাঁচটায় ফিরতি ট্রেকারদের আনতে যাবে। তার নাম্বার রেখে দিলাম। তারা বারবার জানতে চাইছিলো, আমি কোন হোটেলে উঠেছি? আমি কাটিয়ে গিয়েছি। একটা হোটেলে ঢুকে চাওমিন খেয়ে নিলাম আর ফোনে চার্জ দিলাম। ঘুম থেকে খুব ভোরে উঠতে হবে, না হলে সব কিছু গুছিয়ে বাস স্ট্যান্ড আসতে সময় লাগবে।
বাজার থেকে এসে তাবুতে ঢুকে পড়লাম। বৃষ্টি আসবে বলে মনে হচ্ছে, সঙ্গে ঝি ঝি পোকাদের তীব্র শব্দ। মধ্যরাতে ঠিকই মুষলধারে বৃষ্টি নামলো। তাবুর দরজা দিয়ে বৃষ্টির ফোঁটা শরীরে লাগছে। তাবুটা সরিয়ে একটু ভিতরের দিকে নিয়ে এলাম। বসে বসে অন্ধকারে বৃষ্টি উপভোগ করলাম। রাতও শেষের পথে। আস্তে আস্তে তাবু, ব্যাগ সব গোছানো শুরু করলাম। ইয়াশওয়ানকে চারটায় ফোন করলাম, বেশখানিক পরে সে ফোন ধরলো, আশ্বস্ত হলাম। বৃষ্টি এখনো অঝরে ঝরছে। সব কিছু নিয়ে পঞ্চ গায়ে দিয়ে বাজারের দিকে হাটা ধরলাম।
ইয়াশওয়ান সময় মতোই এলো। সকাল সাতটা নাগাদ লোহাজং পৌঁছে গেলাম। ভাড়া দিলাম ৫০ রুপি। সেখানে বলবীর সিং এর রেস্টুরেন্টে নাস্তা করলাম আর আমার বাড়তি জিনিসপত্র লেফট লাগেজ করে রেখে দিলাম। ফেরার পথে নিয়ে যাব। সেখানে বেশ কিছু হোমস্টে আছে। অন্যান্য ফিরতি ট্রেকারদের থেকে তাদের অভিজ্ঞতা শুনলাম। সবাই শুভকামনা জানালো আর একা বাংলাদেশ থেকে এসেছি বলে বেশ উৎসাহ দেখালো। সকাল সাড়ে সাতটায় বেরিয়ে পড়লাম লোহাজং থেকে। ওয়ান ভিলেজ হয়ে ‘গেরলি পাটাল’ পর্যন্ত যাবার পরিকল্পনা। পথে ট্রাক কোম্পানি ক্রেজি পিকস্ এর পাঁচু আর প্রকাশের সঙ্গে পরিচয় হল। তারা খুব আন্তরিকতা দেখালো। রাস্তার খুঁটিনাটি কিছু তাদের থেকে জেনে হাটা শুরু করলাম ‘ওয়ান’ গ্রামের দিকে। এটি আসলে গাড়ির রাস্তা ধরে হেটে চলা, আমি ভেবেছিলাম ট্রেকিং রুট হবে। কিছুদূর চলার পরে বেশ বিরক্ত বোধ হচ্ছিল। এসব রাস্তা পাহাড় কেটে বানানো, তাই রাস্তার পাশে তেমন কোন বড় গাছও নেই যে দাঁড়িয়ে প্রাণ জুড়াতে পারবো।
‘ওয়ান ভিলেজ’ যখন আর মাত্র এক কিলোমিটার বাকি তখন রাস্তার কাজ করে পাথর নেয়ার একটি গাড়ি যাচ্ছিল। হিচ হাইকিং এর উদ্দেশে তাদের অনুরোধ করলাম আমাকে ‘ওয়ান’ পর্যন্ত যেন নামিয়ে দেয়। তারা আমার অনুরোধ রাখলো। ‘ওয়ান’ থেকে পাহাড়ি পথ ধরে এবার হাটা শুরু করলাম। যার সাথেই দেখা হচ্ছে সে জিজ্ঞেস করছে, ‘আকেলা আয়া’, মানে একাই এসেছো? আমি মাথা নেড়ে বলি হুম। সবাই তাকিয়ে থাকে আর ঢাকা থেকে এসেছি শুনে আরো থ’ হয়ে যায়।
বড় বড় গাছ আর ছোট লোকালয় পার হয়ে উপরে উঠতে থাকি। একা চলার কারণে কারো জন্য দাঁড়াতে হচ্ছে না। নিজের সুবিধামতো বিশ্রাম করতে পারি। পানি, এনার্জি বার খেয়ে নেই। পথের সৌন্দর্য বারবার মোহিত করছে। ওয়ানের পর থেকেই মূলত জঙ্গলের শুরু, যাকে বলে সেংচুয়ারি। এর জন্য ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের অনুমতি আর ফিও দিতে হয়। এর নাম ‘পুরবী পিন্ডারী’ ফরেস্ট। জায়গাটার নাম ‘রানাকান্দাহার’। যে কয়দিন এই ফরেস্টে থাকবো ক্যাম্পিং চার্জ সব মিলিয়ে আমার ফি হলো পাঁচশো রুপি। এই রশিদ অন্য কোন ফরেস্ট চৌকিতে চাইলে দেখাতে হবে।
একা পথ চলতে কেমন জানি লাগছিলো। কারো জন্য কোনো অপেক্ষার ব্যাপার নেই। নিজের আনন্দ-দুঃখ নিজের কাছেই রেখে হেটে চলেছি। ফরেস্ট ক্যাম্প এখান থেকে বিশ মিনিট হবে। একটা গ্রæপ এখান থেকে বেরিয়ে গেছে। ভাবলাম একটু জোরে হাটলে হয়তো তাদের ধরতে পারবো। ট্রেইল ধরে হাঁটতে হাঁটতে অনেক দূর চলে এলাম। গভীর জঙ্গল শুরু হয়ে গেলো। সামনে নীলগঙ্গা নদী। দূর থেকে জলের ¯্রােতের তীব্র শব্দ কানে আসছে। কিন্তু কোন জনমানবের কথার শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম না। অনেক দূরে কিছু ট্রেকারকে দেখলাম। একটু সাহস ফিরে এলো। বিচিত্র ধরণের পাখি আর বৃক্ষে পরিপূর্ণ এই বন। দেরি হবে বলে নদীর কাছে গেলাম না। ট্রেইল ধরে পাহাড়ের উপরের রাস্তা ধরলাম। নদী পার হয়ে যেতে যেতে তারা আরো এগিয়ে গেল। নদী পর্যন্ত আসতে রাস্তাটা ঢালু, তাই কষ্ট কম হয়েছে। এবার উপরে উঠার পালা। শুধু উঠছি আর উঠছি। গাছের গুড়ি আর পাথর বাধানো আঁকাবাঁকা রাস্তায় শুধু হেঁটে চলছি। কখনো কখনো কুয়াশা ঢেকে আবছা স্যাঁতসেঁতে, গা ছমছমে ভাব তৈরি হচ্ছে। আবার সব পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে।
হাঁটতে হাঁটতে থেমে যাচ্ছি, আবার কোথাও বসলেই গায়ে জ্যাকেট চাপাতে হচ্ছে। সাপের মতো পেঁচানো এই রাস্তা অনেক দূর অবধি পাহাড়ের চঁ‚ড়ার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। বিচিত্র ধরণের পোকার ডাক, পাখির মিষ্টি সুর, নিঃসঙ্গতা, স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ, জনমানুষের কোন দেখা নেই। ভারি ব্যাগ নিয়ে ট্রেকিং স্টিক ঠুকে ঠুকে এক পা দুই পা করে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। বেশ অনেক দূরে গিয়ে ইন্ডিয়ান হাইকস এর একটা গ্রæপের সাথে দেখা হলো। তাদের মধ্যে দু’জন বাঙালী ডাক্তার ছিলেন। তাদের সাথে কথা হলো। আজ রাত তারা ‘গেরলিপাতাল’ থাকবে।

কিছু দূর যাবার পর একটা ঢাল পেলাম যেখানে ট্রেকারর্সদের জন্য অস্থায়ী ধাবা বানানো হয়েছে। সেখানে নুডুলস, পানি, জুস পাওয়া যায়। পাঁচু আর অন্য ট্রেকারদের সাথে দেখা হলো ঐ ধাবায়। সেখানে রেস্ট করে আবার রওনা দিলাম বড় গ্রæপটার সাথে। তিনটা নাগাদ পৌঁছে গেলাম ‘গেরলিপাতাল’। আমার পরিকল্পনা অনুসারে এখানেই আজকে রাতে থাকার কথা। এখানেও একটা ধাবা আছে, সেখানে বসতেই মুষলধারে বৃষ্টি নামলো। পাঁচু বললো ‘বেদনিবুগিয়াল’ আর বেশি দূরে না। দু’ঘন্টার মতো লাগবে। সন্ধ্যার মধ্যে সবাই পৌঁছে যাবো। তাদের টেন্ট সেখানে পিচ করা আছে। চাইলেই আমি তাদের সাথে থাকতে পারি। প্রকাশ ক্রেজি পিকস এর অন্যতম কর্ণধার, সেও আমার সাথে অনেক গল্প করলো। বাংলাদেশ থেকে বড় একটা গ্রæপ তাদের সাথে রুপকুÐে গিয়েছিল বলে জানালো। প্রকাশও বললো আমাদের সাথেই উপরে চলো। তাদের সঙ্গে ছিল হারিস, মমতা, ধাবান আর পূজা। তারা সবাই মুম্বাইতে চাকরি করে। ঈদ আর অন্য ছুটিগুলো মিলিয়ে ট্রেক করতে চলে এসেছে। এদের সাথে গাইড হিসেবে আছে অর্জুন দানু। ঘণ্টাখানেক পরে বৃষ্টি কমলো। কথা বলতে বলতে আমরা ‘বেদনি বুগিয়াল’ চলে এলাম। এখন প্রায় সন্ধ্যা, ফ্রেশ হতে চা চলে এলো। হাই অলটিটিউডে হেঁটে এসে সঙ্গে সঙ্গে শুয়ে পড়তে হয় না। তাতে শরীর খারাপ করে। তাই ইচ্ছে করেই গা এলিয়ে দিলাম না। চায়ে চুমুক দিয়ে গল্প করতে বসলাম। অন্যান্য ট্রেকারদের সাথে পরিচিত হলাম। টিন দিয়ে ঘেরা কিচেনে আগুনের কাছে এসে বসলাম। ‘বেদনি বুগিয়াল’ জায়গাটা বেশ মনোরম। সবুজের সমারোহ চারিদিকে, বিস্তীর্ণ প্রান্তরকে হিন্দিতে বলে বুগিয়াল আর ইংলিশে বলে মিডো। পাহাড়ের মধ্যখানে বিশাল জায়গা জুড়ে ফাঁকা মাঠ, সেখানে রঙিন অনেক তাবু জায়গাটাকে আরো আকর্ষণীয় করে তুলেছে। গোধূলি বেলায় অস্তমিত সূর্য যেন সোনা ঝরছে স্বগের্র দুয়ারে। বহুকাল যেন এই সৌন্দর্যের মাঝে বসবাস করা যায়। হীম শীতল আবহাওয়ায় চায়ের কাপ হাতে পৃথিবীর অপার সৌন্দর্যকে অবলোকন করা যায়। জাগতিক জিনিস এর কাছে সত্যিই তুচ্ছ আর ঠুনকো। এত কষ্টে এখানে আসতে পারলেও জীবন স্বার্থক বলে মনে হয়। টাকা দিয়ে কেনা শহরের সুখ স্বাচ্ছন্দ এর তুলনায় ধূলিকনা।
আজকের আকাশ আর আবহাওয়াটাও চমৎকার। শরীর ক্লান্ত, তারপরও স্মৃতিতে ধরে রাখতে ছবি তুলে নিলাম। ‘বেদনি
বুগিয়াল’ পাহাড়ের উপর থেকে দেখতে অদ্ভুত সুন্দর লাগে। ক্যানভাসে আঁকা চিত্রকর তার তুলির প্রতিটি আচড়ে যেন এই দৃশ্যমান ছবি এঁকে রেখেছেন। বিধাতার এ সৃষ্টিকে শুধু অনুভব করা যায়। তিনি যেন সুযোগ দেন বারবার এমন সুন্দরকে দেখার। অসংখ্য ছোট ছোট হলুদ ফুলে ভরপুর এই বুগিয়াল। সবুজ ঘাসের জন্য ঘোড়াদেরও প্রিয় জায়গা এ বুগিয়াল।
রাতে খাবারের জন্য খিচুড়ি রাধার চেষ্টা করলাম। এখান থেকে রেডিমেড খিচুড়ি প্যাকেট নিয়ে গিয়েছিলাম। আমি এখন প্রায় ১২ হাজার ফুট উচ্চতায় আছি। সুতরাং এই উচ্চতায় খোলা পাত্রে রান্না করা বেশ কষ্টকর কাজ। প্রকাশ তার স্টোভ দিলো রান্না করার জন্য। মেস্টিনে (রান্না করার পাত্র) খিচুড়ি বসিয়ে আধা ঘন্টা যাবার পরেও দেখলাম চাল সেদ্ধ হবার কোন নাম নেই। এদিকে রাতও বাড়তে লাগলো। আধা সেদ্ধ সেই খিচুড়ি কোন রকম খেয়ে শুয়ে পড়লাম।
সকালে আবার সেই খিচুড়ি খড়ির চুলায় সেদ্ধ করার চেষ্টা করলাম। ভালো করে হলো না। তাই খেয়ে চলা শুরু করলাম। গন্তব্য বেইজ ক্যাম্প ‘বাগুয়াবাসা’। পাঁচু প্রস্তাব দিল সামনে অনেকখানি চড়াই আছে, প্রয়োজনীয় জিনিস রেখে ব্যাকপ্যাক গাধার পিঠে দিয়ে দিতে। তার পরামর্শটা নিলাম এবং ৩০০ রুপি দিয়ে বাগুয়াবাসা পর্যন্ত ব্যাগ গাধার মালিকের জিম্মায় দিয়ে দিলাম। এখানে প্রতি গ্রামের দূরত্ব হিসেব করে গাধার ভাড়া নেওয়া হয়। অর্থাৎ এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রাম পর্যন্ত ২০০ থেকে ৩০০ রুপি করে পড়বে। রুট হচ্ছে বেদনি বুগিয়াল-ঘোড়ালোটানি-পাথারনাচুনি-কালুবিনায়াক-বাগুয়াবাসা (বেইজ ক্যাম্প)।
‘বাগুয়াবাসা’ বেইজ ক্যাম্পে ভালোভাবেই পৌঁছে গেলাম। বেশ চড়াই পার হতে হয়েছে আসার সময়। ‘বেদনি বুগিয়ালের’ পরে আর কোন বড় গাছপালা নেই। এত উচ্চতায় থাকারও কথা না। কখনো কুয়াশায় পুরো এলাকা ঢেকে যাচ্ছে আবার পরিষ্কার রোদ ঝলমল করছে। বৃষ্টির কবলেও পড়তে হলো। বেদনির পরে এলো ‘ঘোড়ালোটনি’।
পাথারনাচুনিতে আমরা দুপুরের খাবার খেলাম, খিচুড়ি, পাপড়, আচার আর সালাদ। গাব্বারজি তার ধাবায় আমাদের জন্য রান্না করেছে। এসব জায়গাগুলো তাবুর পাশাপাশি ট্রেকারদের থাকার জন্য ফাইবারের শেড দেওয়া আছে। ভাড়া হিসেবে সেখানে জনপ্রতি থাকতে পারবে। আজকে ছিল ঈদের দিন। বাড়ির কথা মনে পড়ছিলো।। এমন সুন্দরের মাঝে থাকতে পারাই ঈদের আনন্দের সাথে ভাগ করে নিলাম।
‘কালুভিনায়াগ’ থেকে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। পঞ্চ দিয়ে সেই বৃষ্টির ফোঁটা আর ঠেকানো গেল না। শুধু ছুটে চলা। এই পথটা বেশ পাথুরে আর বৃষ্টির জন্য বেশ পিচ্ছিলও হয়ে পড়েছিলো। দূরে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড় চঁ‚ড়াগুলো মেঘের আড়ালে ঢেকে যাচ্ছে আবার মুখ তুলে চাইছে। ‘বাগুয়াবাসা’ জায়গাটা পাথর দিয়ে ঢাকা প্রান্তর। অস্তমিত সূর্যের লাল আভা যখন পাহাড়ের গায়ে এসে পড়লো তার রক্তিম আভায় যেন পুরো এলাকাটা স্বর্ণালী হয়ে উঠলো। স্বর্গীয় সে দৃশ্য কোন ভাষা দিয়ে প্রকাশিত নয়। ক্যাম্প থেকে একটু ডানে তাকালে মাথা উচু করে সবার উপরে দাঁড়িয়ে আছে পর্বত ত্রিসূল (৭১২০মিটার) এবং নন্দাঘুন্টি (৬৩০৯মিটার)। চোখের সামনে এঁদের দেখে রীতিমত শিহরিত হচ্ছি। এই পর্বতগুলোতে যাওয়ার উন্মাদনা স্বপ্নে এসে হানা দিচ্ছে। বেইজ ক্যাম্পে পৌঁছে প্রকাশ এর টিম সবাইকে পরদিন যাওয়ার ব্যাপারে ব্রিফিং দিলো, কীভাবে কাটাওয়ালা জুতা পরতে হয় শিখিয়ে দিলো।
এখন আছি প্রায় ১৩,০০০ ফিটের কাছাকাছি। পাহাড়ে খুব তাড়াতাড়ি সন্ধ্যা নামে। কনকনে ঠান্ডা আর অক্সিজেনের স্বল্পতা খুব তাড়াতাড়ি মানুষকে কাবু করে ফেলে। কিছু খেতেও ইচ্ছে করে না। তারপরও শক্তির জন্য খেতে হয়। ভোরে বের হতে হবে রূপকুÐ লেকের পথে। একটা রুটি আর সবজি দিয়ে কোন রকমে খেয়ে নিলাম। গোলাবজামুন আর সনপাপড়িটা মুখে একটু রুচি ফিরিয়েছে।
সারারাত শুধু এপাশ ওপাশ করেছি। ঘাড় আর মাথা ব্যথায় ঘুম হয়নি একদম। আমি,পাঁচু আর প্রকাশ পাথর দিয়ে বানানো কিচেন ঘরেই ঘুমিয়েছি।
এতো পাথুরে জায়গায় তাবু খাটানো বেশ অসুবিধার। এর উপর যে ঠাÐা বাতাস আর বৃষ্টি আমার তাবু এখানে টিকবেনা। ক্রেজি পিকস আর ইন্ডিয়া হাইকস এর টেন্ট এ বেশিরভাগ জায়গা নিয়ে ফেলেছে। রাত তিনটার সময় বের হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু, রাত চারটা থেকে মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। রূপকুÐের চ‚ঁড়াতে আগেভাগে রওনা না দিতে পারলে সূর্যের তাপে বরফ গলতে শুরু করবে এবং আবহাওয়া খারাপ হতে থাকে, ফলে নেমে আসাটা কষ্টকর হবে।
প্রথমে ভেবেছিলাম আজকে আর উপরের দিকে যাওয়া হবে না। প্রকাশকেও বেশ দুশ্চিন্তায় দেখলাম। সে ট্রেক লিডার, আর এখানে ট্রেকার আছে প্রায় ৩৫ জনের মতো। হয়তো উপরে না উঠে ফিরে যেতে হবে। বৃষ্টির আলামত এমন দেখেও প্রকাশ ঠিক করলো ছয়টা পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। এতো বছরের অভিজ্ঞতায় তাকে ভাল কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছে। ভোর চারটায় বৃষ্টি কিছুটা কমে এলো। সবাই তিনটা থেকেই রেডি হয়ে বসে আছি। জানিয়ে দেওয়া হলো ব্রেকফাস্ট করেই বেরিয়ে পড়তে হবে। কনফ্লেক্স দুধ আর সুপ খেয়ে সবাই লাইন ধরে হাঁটা শুরু করলাম। গতকাল বিকেলেই সবাইকে ইন্সট্রাকশন দিয়ে দেওয়া হয়েছে। একজোড়া করে মাইক্রো স্পাইকস সবাইকে দেওয়া হয়েছে। এটাকে ক্র্যাম্পনের মিনি সাইজ বলা যেতে পারে। তবে এর কাঁটা ছোট আর সঙ্গে রাবার লাগানো, তাই যেকোনো জুতায় সেট হয়। এই মাইক্রো স্পাইক্সগুলো এখানে পরতে হয়, কারণ এই বরফগুলো তেমন শক্ত না। ভেজা তুলোর মতো। ছোট ছোট স্টেপে আমরা এগিয়ে চলেছি। এই গ্রæপে ষাট বছরের একজন হোমিওপ্যাথ ডাক্তারও রয়েছে, নাম ডা. এনসাই। তার ছেলেকে নিয়ে ট্রেকিংয়ে বেরিয়েছেন। বেশ উৎসাহ পেলাম তাকে দেখে। তার সাথে গল্প করতে করতে হেঁটে চললাম।
বেশ কিছু বরফ গলা ঝিরি পেরিয়ে উপরের দিকে উঠছি আর শুভ্র বরফের পাহাড় আমাদের আলিঙ্গন করতে থাকলো। এর সঙ্গে উচ্চতা আরো বাড়তে লাগলো। ঠাÐা, উচ্চতা আর অক্সিজেন, সব কিছুর সাথে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলো। যত উপরে উঠছি নিচের পাহাড় আর মেঘের লুকোচুরি খেলায় বিমুগ্ধ করছে। রূপের কুÐের সামনে যখন দাঁড়ালাম সব কষ্ট উবে গেল। লেকটা পুরো বরফে ঢাকা। আরো কিছু এগিয়ে গেলে ‘জুনারগলি’। একটা গ্রæপ ততক্ষণে উপরের দিকে উঠা শুরু করে দিয়েছে। আমি ছবি তোলায় মন দিলাম। ততক্ষনে রোদ ঝলমলে সকাল হয়ে গেছে। মাথাটাও ভনভন করছে। রূপকুÐ লেকের উচ্চতা ১৬,৪৯৯ফিট। একে স্কেলিটন লেকও বলা হয়। কারণ এখানে মানুষের কঙ্কাল পাওয়া গেছে ১৯৪২ সালে। বরফ গলে গেলে এই কংকালগুলো বিভিন্ন জায়গায় দেখা যায়। তবে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় কিছু কঙ্কাল আর খুলি সাজিয়ে রাখা হয়েছে। তার পাশেই ছোট একটা মন্দির বানানো আছে পাথর দিয়ে। বিজ্ঞানীরা এই কংকাল থেকে সনাক্ত করেছেন যে, এগুলো প্রায় ১২০০ বছর পূর্বে নবম শতাব্দির সময়কার মানুষের কংকাল । আধঘণ্টার মতো সেখানে থাকতে পেরেছিলাম। মাতৃভূমি বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে কিছু ছবি তুললাম। আশপাশটা একটু ঘুরে দেখলাম। উচ্চতার কারণে মাথায় বেশ ব্যথা অনুভব হচ্ছিল তখন, নিচে নেমে যাওয়া হচ্ছে এর মূল সমাধান। খুব দ্রæত আবহাওয়া খারাপ হতে শুরু করলো। পুরো এলাকা কুয়াশায় ঢেকে যাচ্ছে। পাহাড়ের চূঁড়াতে নিয়ম হলো ভোরে ভোরে পৌঁছুতে হয়, কারন যত বেলা বাড়ে আবহাওয়া ততো খারাপ হতে থাকে। এবার নেমে যেতে হবে দ্রæত। এর মধ্যে জুনারগালি যাওয়া টিমও ফিরে আসলো। সবাই একত্রে নামতে শুরু করলাম। সেইদিন বাগুয়াবাসাতেই রাত কাটিয়ে দিলাম। সে রাতেও প্রচুর বৃষ্টি হয়েছিল। পরদিন সকালে ‘বাগুয়াবাসা’ থেকে একদিনে একই পথে ‘লোহাজং’ চলে এলাম। সুখকর কিছু স্মৃতি নিয়ে পাহাড় থেকে নেমে এলাম। আর ভাবতে লাগলাম কবে ফিরে আসবো এই স্বর্গের মাঝে।