আলোর রাজ্যে

এখানে ভ্যানে চড়ে চলাচল নিত্যনৈমিত্তিক, আমাদের কাছেও বেশ মজার। রোদ পড়েছিল বেশ, সালমা আপা আর সিগ্ধা রঙ্গিন ছাতা মেলে ধরলো। এবারে আমাদের সঙ্গী ফরাসি-ফিরিঙ্গি পর্যটক আরউইন। তার কথাটা একটু বলে নেই, বাড়ি সুদূর ফ্রান্সে, ছবি তোলে সখে আর নেশা ঘুরে বেড়ানো। বাংলাদেশে এসে সে মায়ায় জড়িয়ে ফেলে নিজেকে। কত শত হাজার ছবি যে সে তুলেছে এই বাংলার মায়া ভরা মানুষের, সজীব প্রকৃতির, আর আমাদেরও।

Date

travel

আলোর রাজ্যে

Date

Share


Instagram logoTwitter logoYouTube logo

চা খেতে খেতে আজিজ মার্কেটে পরিচয় কচি ভাইয়ের সঙ্গে। পরিচয়টা করিয়ে দেন আমাদের রাসেদ ভাই। তখন আমাদের পরিকল্পনা চলছিল এবছর ২১শে ফেব্রুয়ারিতে কোথাও যাবার। কচি ভাই জানালেন তারা এগারো বছর থেকে নড়াইলের ভিক্টোরিয়া কলেজ মাঠে ভাষা দিবস উৎযাপন করেন মোমবাতি জালিয়ে। বিশাল সে আয়োজন। ১ লাখ মোমবাতি জালানোর ইচ্ছে তাদের, প্রচেষ্টাও সেইরকম। গণি ভাইকে গিয়ে বললাম এমন জায়গায় তো যাওয়া অতীব কর্তব্য। বিটিইএফ(বাংলাদেশ ট্যুরিজম এক্সপানসন ফোরাম) এর অফিসে সবাইকে জানানো হলো। এক কথায় সব রাজি, আকর্ষণ তো আরো অবশিষ্ট আছে। নড়াইলে আছে দেখার অনেক কিছু, আছে দেশের খ্যাতিমান শিল্পী সুলতানের বাড়ি। তার নিজ হাতে বানানো শিশুস্বর্গ।

আমরা দলে ১৯ জন। বাস ছাড়ল গাবতলী থেকে, রাত ১১টায়। ভোরে বাস থেকে নামার পর নামতে বেলা বেড়ে পেটে হাত পড়লো। আমরা কলেজ রোডের রূপগঞ্জ বাজার এ ভরপেট খানা সেরে নিলাম।

নড়াইল শহরটা বেশ ছিমছাম, তেমন কোনো সোরগোল নেই। চিত্রার পাড় ঘেঁষে এ শহরটি যেন তার রূপ-যৌবন আজও ধরে রেখেছে। আয়তনেও বেশ বড় না, এর দক্ষিণে খুলনা আর পশ্চিমে যশোর জেলা। কচি ভাইয়ের রেফারেন্স এ আমরা ইন্ট্রিগ্রেটেড ন্যাসনাল এন্ড সোস্যাল এড্যভান্সমেন্ট ফোরাম নামে একটি এনজিও এর অফিসে গিয়ে হাজির হলাম। সেখানে আসাদ ভাই আমাদের জানান পরদিন ২১শে ফেব্রুয়ারিতে তারা কি প্রস্তুতি নিয়েছেন। মূল আয়োজন ভিক্টোরিয়া কলেজ মাঠে। তবে আমাদের হাতে আরো একদিন সময় আছে, আমরা বেরিয়ে পড়লাম। এখানে ভ্যানে চড়ে চলাচল নিত্যনৈমিত্তিক, আমাদের কাছেও বেশ মজার। রোদ পড়েছিল বেশ, সালমা আপা আর সিগ্ধা রঙ্গিন ছাতা মেলে ধরলো। এবারে আমাদের সঙ্গী ফরাসি-ফিরিঙ্গি পর্যটক আরউইন। তার কথাটা একটু বলে নেই, বাড়ি সুদূর ফ্রান্সে, ছবি তোলে সখে আর নেশা ঘুরে বেড়ানো। বাংলাদেশে এসে সে মায়ায় জড়িয়ে ফেলে নিজেকে। কত শত হাজার ছবি যে সে তুলেছে এই বাংলার মায়া ভরা মানুষের, সজীব প্রকৃতির, আর আমাদেরও। গণি ভাই সহজ নাম দিয়েছে হারূন, ডাকতেই উত্তর দেয় ‘ইয়া ইয়া হারূন’। সাচ্ছন্দে সব কিছু করেছে আমাদের সঙ্গে। আসলে মানুষের সাথে, প্রকৃতির সাথে পুরোপুরি মিশতে পারলেই আসল ঘোরার মজা পাওয়া যায়।

চিত্রার পাড়ের বাঁধানো ঘাটে এসে ভ্যান থামলো। একে ভিক্টোরিয়া ঘাট বলে আর স্থানীয়ভাবে বলে বান্ধাঘাট। চিত্রা বেশ শান্ত নদী। এর গতি প্রকৃতিও শান্ত। চুয়াডাঙ্গা ও দর্শনার নিম্নাঞ্চল থেকে মূলত এর উৎপত্তি। এরপর নদী তার আপন গতিতে চলে, নবগঙ্গার সাথে তার বন্ধুত্ত হয়। আমরাও বন্ধু হতে চাই চিত্রার আর চিত্রার পাড়ের মানুষের। রাতে তাই থাকবার জায়গা পেয়ে যাই চিত্রার পাড়ের পরিত্যক্ত শ্বশান এ। জায়গাটা শুনশান, একটা বড় পুরনো মন্দির আছে। গোবরা বাজার থেকে একটু ভেতরে এই শ্বশান সমেত মন্দির। লবি ভাইয়ের বাড়ি মন্দিরের ঠিক পেছনেই। তিনি আমাদের নৌকা ঠিক করে দিলেন। শান্ত নদীতে আমরা ঘুরে বেড়ালাম সন্ধ্যা অবধি, আর গান হৈচৈ কত না আনন্দ। এ নদীতে ইরাবতী ডলফিনের বাস, মাঝে মধ্যে তাদের কতগুলোকে ভেসে উঠতে দেখা গেল। তারা শান্ত প্রাণী, তাই এখানকার কেউ তাদের বিরক্ত করতে আসে না। এ ডলফিন গুলো এখন বিলুপ্ত প্রায় প্রজাতি, তারপরও আমাদের সুন্দরবন আঞ্চলে প্রায় ৬ হাজার ইরাবতি ডলফিন আছে। মূলত দক্ষিন ও দক্ষিন পূর্ব এশিয়ার বড় বড় নদী এবং মিঠা পানির লেগুনে এ ডলফিনের বাস। এরা লম্বায় সাড়ে ৬ ফুট থেকে ৮ ফুট অব্দি হয়ে থাকে। নোমানি ভাই আর ইভান ভাইকে দেখলাম অনেক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ডলফিনের ছবি তুলতে, তারাও যেন বুঝে, শুধু শরীর দেখিয়েই দৌড় দিচ্ছে। সন্ধ্যা হতেই আমরা পাড়ে ফিরে গেলাম। জনা কয়েককে দেখলাম মন্দিরে পূঁজা-অর্চনা করছে। লবি ভাই আমাদের জন্য তার বাড়ির উনুনে রান্না চড়ালেন। তার হাতে চমক আছে বলতে হবে, খোশগল্প করতে করতে কি মজার সব আইটেম তিনি রেধে ফেললেন। মুরগি ভুনা, ঘন ডাল আর খিচুড়ি, অমৃত লেগেছিল তখন। রাতভর চলল আড্ডা চাঁদনি রাতে চিত্রার পাড়ে। প্রকৃতিই যেন আমাদের আরো উন্মাতাল করে তুলেছিল।

Adventure

সকালে আমরা রওনা দেই খুলনা আর যশোরের সীমান্ত এলাকা অভয়নগরের পথে। যাত্রার পুরোটা পথ ভ্যানে করে। আমরা ভাটপাড়া গ্রামে এসেতো হতবাক, এখানে রয়েছে প্রায় আড়াইশ বছরের বেশি পুরোনো ১১টি শিব মন্দির। একে এগারদুয়ারি মন্দিরও বলা হয়। স্থাপত্য কলায় পরিপুর্ণ বলা যায় মন্দির গুলোকে । সাগর আর গনি ভাই তাদের স্থাপত্য বিদ্যার নজর দিয়ে বেশ খুটিয়ে খুটিয়ে দেখছিল সেগুলো। আমরা স্থানীয়দের থেকে কিছু তথ্য জানার চেষ্টা করি। মন্দিরে বড় আকৃতির কষ্টি পাথরের শিব মূর্তি ছিল, পূঁজা-অর্চনাও হত বড় করে তবে ৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের সময় এর বেশ ক্ষতিসাধন হয়। এই মন্দিরকে ঘিরে গল্পগাঁথা রয়েছে যে, অভয়নগরের সেসময়কার রাজার একমাত্র মেয়ের নাম ছিল অভয়ারানী। তার নামানুসারেই এর নামকরন করা হয়। একদিন রাজা স্বপ্নে দেখল তার প্রিয় কন্যাকে দেবতা শিবের সাথে বিয়ে দিয়ে তাকে উৎসর্গ করতে হবে। রাজা তাই করলেন। গল্পের শেষ হল, আমরাও বুড়ি ভৈরব নদীর ধারে যেতে শুরু করলাম। খেয়া পার হয়ে আবার ভ্যান, ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের রাস্তায় এসে পড়লাম। ফুলতলার দক্ষিনদিহীতে রয়েছে রবীন্দ্রনাথের শ্বশুরবাড়ী। বর্তমানে প্রতœতত্ত অধিদপ্তর এর সংস্কার কাজ করছে। আমরা ঘুরে ফিরে বাড়িটি দেখলাম। আবার ফিরে এলাম ঘাটে। পার হয়ে সিঙ্গারী বাজার। এখান থেকে বাস ধরতে হবে আবার নড়াইলের। এদিকে বাজারে লোক জড়ো হয়ে গেল আরউনকে দেখতে। সেও মজা পেয়েছে, ছবি তোলা শুর করলো সবার। বাসে যে উঠবো তার তিল ধারনের জায়গা নেই। সবাই গিয়ে উঠলাম বাসের ছাদে। সে এক মজার অভিজ্ঞতা। বড় বড় গাছের ডাল আমাদের মাথার সাথে বারি খাচ্ছে। আমরা চিৎকার দিয়ে উঠলাম ‘গাছ গাছ ডাইল ডাইল’। আরউইনও আমাদের সাথে বলতে শুরু করলো একই কথা। এরপর আরউইন কে পুরা ট্রিপেই সবাই বলেছে ‘গাছ গাছ ডাইল ডাইল’।

Adventure

গোবরা বাজারে পৌঁছাতে আমাদের প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেল। আমরা এস এম সুলতানের বাড়ির সামনে নামলাম। নড়াইল জেলার গর্ব তিনি, জগতজোড়া খ্যাতি তার। আমরা তার জীবদ্দশায় সঠিক মূল্যায়ন করতে পারিনি। চিত্রশিল্পী সুলতানের বাড়িতে এখন তার ছবির সংগ্রহশালা আছে। প্রকৃতি এবং শিশুদের তিনি অনেক বেশি ভালবাসতেন, তাই শিশুদের ছবি আকার জন্য তিনি একটি বড় নৌকা তৈরি করেন আর এর নাম দেন ‘শিশুস্বর্গ’। তিনি শিশুদের নিয়ে চিত্রা নদীতে ঘুরে বেড়াতেন আর শিশুদের ছবি আকা শেখাতেন। এস এম সুলতান জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৯২৩ সালের ১০ আগস্ট আর তার প্রয়ান হয় ১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবরে। প্রতিবছরই এই নড়াইলে সুলতানের জন্ম-জয়ন্তী উৎসব পালিত হয় বেশ বড় আকারেই। আসাদ ভাই জানালেন, এবছরও মেলা হবে এস এম সুলতান শিশু চারু ও কারুকলা ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আগামি ১০, ১১ এবং ১২ আগস্ট। এখানে আর্ট ক্যাম্প বসবে, শিশুকিশোররা ছবি আঁকবে, বড়রাও আঁকবে। ভিক্টোরিয়া মাঠে মেলা বসবে। আমরা এবার মাঠের দিকে যেতে শুরু করলাম। দূর থেকে ভেসে আসছিল ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি’ গানের চরনগুলি। ভিক্টোরিয়া কলেজ মাঠে গিয়ে তো আমরা হতবাক! এত বিশাল জায়গা জুড়ে মোমবাতির আলো ছড়িয়ে পড়েছে, দেখেই সবাই মুগ্ধ হয়ে গেলাম। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা একটি একটি করে মোমবাতি মাঠে সাজাচ্ছে আর তা একেকটি বর্ণমালায় রূপ নিচ্ছে। না দেখলে কাউকে বোঝানো মুশকিল যে কত সুন্দর সে দৃশ্য। আমরা ছবি তুলতে রীতিমত পাগল হয়ে গেলাম। কতশত মানুষ যে সেদিন জড় হয়েছিল বলা মুশকিল। ভিক্টোরিয়া মাঠের পরিধিও কম বড় না, দৈর্ঘ্য- প্রস্থে প্রায় ১ কিলো মিটার হবে। মাঠকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। দুটি ভাগেই মামবাতির বিশাল সমারোহ। এর একটি ভাগে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে এবং আর একটিতে মোমবাতি দিয়ে শহীদ মিনার এর মত তৈরি করা হয়েছে। আমরা এর পুরো সৌন্দর্য দেখতে মাঠের এক পাশে নির্মানাধীন ছাদে গিয়ে উঠলাম। মোমবাতির আলো নিভে আসে কিন্তু তবুও আমাদের চোখ জুড়ায় না। শহীদের স্মরণে এমন উদ্যোগে আমরা স্বাগত জানাই। এবছর এই মাঠে জ্বলে উঠেছিল ৫০ হাজার মোমবাতি। তাদের টার্গেট ১ লাখ মোমবাতি জালানো। এর পেছনে কাজ করে যাচ্ছেন নড়াইলের একুশ উৎযাপন পর্ষদ। তাদের মূল উদ্দেশ্য একুশের চেতনার আলো সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে দেওয়া। এ আলো ছড়িয়ে পড়–ক সারাদেশের মানুষের মধ্যে আর সেই আলোর অনুপ্রেরণায় আমরাও হয়তো নতুন কোনো জায়গার সন্ধানে বেরিয়ে পড়বো আবারো।

Latest Posts

A right black arrow